১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং | ১লা পৌষ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ২৭শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯ হিজরী

ছেঁড়া টাকা, করব কী?

মগবাজার থেকে রিকশায় করে কারওয়ান বাজারে অফিসে যাচ্ছিলাম। পৌঁছে ভাড়া দিতে গিয়ে এক বিপত্তি। কাছে থাকা ১০ টাকার দুটি নোট ছেঁড়া। রিকশাচালক নিতে রাজি হচ্ছেন না, তার ওপর তাঁর কাছে নেই ভাংতি। পরে ব্যাগ হাতড়ে অনেক কষ্ট খুচরো দিয়ে ভাড়া দিলাম। বিরক্তও লাগছিল, ছেঁড়া টাকাটা নিয়ে এখন কী করব?

এমন সমস্যার মুখোমুখি হওয়া লাগে প্রায় প্রতিদিনই। ছেঁড়া নোট পাল্টে নেওয়ার কথা অনেক সময়ই মাথায় আসে না। আসলে ছেঁড়া–ফাটা নোট বদলে নেওয়ার বিষয়ে সামান্য ধারণা না থাকার কারণে অনেককেই এই ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনেক সময় ছেঁড়া বড় নোট বাজারে চলবে কি না, এই দুশ্চিন্তায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন গ্রাহক। ব্যাগের এক কোনায় পড়েই থাকে অচল নোটটি।

শুধু ঢাকা নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও কোনো না কোনো ব্যাংকের শাখা আছে। সবখানেই ছেঁড়া–ফাটা নোট গ্রহণ করা হয়। এমনটাই নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিষয়টি মনিটরিংও করা হয়। এমনকি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে এ বিষয়ে বিশেষ সভা, বিশেষ পরিদর্শন চালায় বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি বছরের মার্চে, কোনো ব্যাংকের শাখা ছেঁড়া–ফাটা নোট বদলে না দিলে সেই ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর (এমডি) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারিও করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সুবিধা প্রদান না করা হলে গ্রাহক বাংলাদেশ ব্যাংক বরাবর অভিযোগ করতে পারেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ছেঁড়া–ফাটা নোট যদি বদলযোগ্য হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকে এসেও বদলে নেওয়া যায়। অবস্থাভেদে ১০০ ভাগ, ৭৫ ভাগ, ৫০ ভাগ রিফান্ড করা হয়। সাধারণত ৫১ শতাংশের কম ছেঁড়া থাকলে নোটের পুরো মূল্যমানই প্রদান করা হয়। তবে একটি নোটের অর্ধেকও কম অংশ থাকলে, তা আর রিফান্ড করা হয় না।

এ ছাড়া দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের যেকোনো শাখায় গিয়ে বদল করে নেওয়া যায় ছেঁড়া–ফাটা নোট এ ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তা মূলত কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত হয়ে অল্প ছেঁড়া–ফাটা ও ময়লা নোটের বিপরীতে সম্পূর্ণ বিনিময়মূল্য (১০০ ভাগ) প্রদান করে থাকেন। গ্রাহকের উপস্থাপিত নোটটির সম্পূর্ণ নোটের তিন–চতুর্থাংশ বিদ্যমান থাকতে হবে এবং আসল নোট হিসেবে শনাক্ত হতে হবে। উপস্থাপিত নোট একাধিক খণ্ডিত হলে দুটি খণ্ডই একই নোটের অংশ হতে হবে। একই টাকা প্রমাণ বোঝাতে পেছনে সরু কাগজ দিয়ে জোড়া লাগানো যাবে।

ব্যাংকগুলোর নির্দেশনায় বলা আছে, তিন–চতুর্থাংশ ছেঁড়া ও ময়লা নোটের ক্ষেত্রে জমা মূল্য সঙ্গে সঙ্গেই প্রদান করা হবে। অধিক ছেঁড়া, অত্যধিক জীর্ণ, আগুনে পোড়া, ঝলসানো এবং তিন–চতুর্থাংশের কম রয়েছে—এমন নোটের বিনিময়মূল্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাপ্তি সাপেক্ষে প্রদান করা হবে। এই মূল্য সংগ্রহের জন্য এসব নোট বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রেরণের ডাক বা কুরিয়ার মাশুল নোট জমাদানকারী থেকে আদায় করা হবে।

তবে এ বিষয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা নানা অজুহাতে পাল্টে দেন না ছেঁড়া নোট। হোটেল ব্যবসায়ী রহমত আলী বলেন, ‘ব্যাংকে গিয়ে এ সুবিধা পাইনি। কয়েকবার ফেরত এসেছি। তাই এখন ছেঁড়া টাকা যাঁরা কেনেন, তাঁদের কাছে দিই। ১০০ টাকায় ৭০ টাকা দেন তাঁরা।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভংকর সাহা বলেন, তফসিল ব্যাংকের শাখাগুলোকে জনসাধারণের কাছ থেকে মূল্যমান–নির্বিশেষে সব ধরনের নোট গ্রহণ, ছেঁড়া-ফাটা ও ময়লাযুক্ত নোটের বিনিময়মূল্য প্রদান করার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটরিংও করে তারা। এ ছাড়া সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি সহজ ও বোধগম্য করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের জারিকৃত পরিপত্র অনুযায়ী, ব্যাংকের প্রতিটি শাখায় জনসাধারণের সহজে দৃষ্টিগোচর হয়, এমন স্থানে ‘ছেঁড়া–ফাটা ও ময়লা নোট গ্রহণ করা হয়’—এই মর্মে নোটিশ স্থাপন করা রয়েছে।

শুভংকর সাহা আরও বলেন, ‘গ্রাহক এই সেবাটি পাচ্ছে কি না, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে যে পরিদর্শন চালানো হয়, তাতে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই গ্রাহক সুবিধা পাচ্ছেন না। ব্যাংকার্স মিটিংয়ে আমি তা বলেছিও। এই অভিযোগ আংশিক সত্য আমরা জানি। তবে সব ব্যাংক এমনটা করে না। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকেও অভিযোগ করা যায়।’

বিষয়টি নিশ্চিত হতে সঙ্গে থাকা দুটি ১০ টাকার নোট নিয়ে কাছের একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখায় যাই। তারা আমাকে ওই নোট পাল্টে ভালো নোট দেয়। ছেঁড়া নোটগুলো কী করা হয়, তা জানতে চাইলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানায়, ১০০টি ছেঁড়া নোট সংগ্রহ করার পর তা বাংলাদেশ ব্যাংককে পাঠানো হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক তিন সপ্তাহের মধ্যে নতুন নোট সরবরাহ করে।

শুভংকর সাহা বলেন, বাজারে বর্তমানে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা নগদ সরবরাহ আছে। গড় হিসাবে ছোট মানের নোটগুলো কম দিন চলে। বড় মূল্যমানের নোটের সিকিউরিটি বেশি থাকে। হাত ঘোরে বেশি ছোট টাকা। তবে গড়ে কত দিন একটি নোট টেকে—সেই হিসাবে বছরে মোট সরবরাহের এক–চতুর্থাংশ বদলে দিতে হয় বাংলাদেশ ব্যাংককে। এগুলো সব যে ছেঁড়া বা ফাটা নোট, তা নয়। ক্লিন নোট পলিসির আওতায় টাকা নেতানো থাকলেও তা আর বাজারে ছাড়া হয় না।

সোমবার, অক্টোবর ১৬, ২০১৭